
আনোয়ার হোসেন রনি | ছাতক সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
ছাতক ও সিলেট বিউবো প্রকল্পের নিবাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া ও সিলেট অঞ্চলে প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির দুনীতি লুটপাট ভুয়া প্রকল্পের সরকারি হাজার কোটি টাকার মালামাল বিত্রিুর অভিযোগে ফেসে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) ছাতক ও
সিলেট অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শাহাদত আলীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুর্নীতির মামলাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিদ্যুৎ খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করে, নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং প্রশাসনিকভাবে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেটের বিউবো ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের একাধিক মালামালে হিসাব নিয়ে চলছে ব্যাপক লোকু চুরি কাজ কারবার। একাধিক তদন্তের ধরা পড়ছে হিসাবের ব্যাপক গড় মিল। এসব বাস্তবে মিলছে প্রকল্পের মাঠে তালিকা খোজে পাওয়া যাচ্ছে না। সিলেট,ছাতক, জগন্নাথপুর,সুনামগঞ্জ সড়কের হাজার হাজার খুটি রাস্তা পাশে ফেলা রাখা হলে ও এর সঙ্গে ক্যাবল তার ও তামার তার লোহা সামগ্রী হিসাব বাস্তবে মিলছে প্রকল্প অফিসে।
এই মেগা প্রকল্পের হিসাব নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন সিলেট প্রকল্পের নিবাহী প্রকৌশলী জিযাউল হক জিয়াসহ একাধিক কর্মকতা কর্মচারিরা। গত ৯ জুন বিউবো পিডির সিলেটে আসেন। এসে সিলেটের মেগা প্রকল্পের নিবাহী প্রকৌশলীসহ কর্মকতা কর্মচারি সঙ্গে মত বিনিময় করেন। এ প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়তে পারবো না বলে প্রকল্পের হিসাব দিয়ে শেষ করতে চান তিনি।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর টাঙ্গাইল দুদক কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. রবিউল ইসলাম বাদী হয়ে মো. শাহাদত আলী ও তার স্ত্রী কোহিনুর বেগমের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, শাহাদত আলী তার সম্পদ বিবরণীতে প্রায় ৩০ লাখ ৭৯ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
একইসঙ্গে তার স্ত্রী কোহিনুর বেগমের নামে প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ ৪৯ হাজার ১৫১ টাকার অসংগতিপূর্ণ সম্পদের তথ্য পাওয়া যায় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৌশলী শাহাদত আলীর অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের একটি অংশ স্ত্রীর নামে রাখা হয়েছিল। তবে কোহিনুর বেগমের নিজস্ব বৈধ আয়ের কোনো উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় দায়ের করা এসব মামলার পরও দীর্ঘ ২ বছর সময় ধরে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মামলার পরও তাকে প্রশাসনিকভাবে প্রত্যাহার বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি রহস্যজনক কারনে। বরং তিনি সিলেট অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থেকে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রকল্পসংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর করে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
তাকে সাবিক সহযোগিতা করেছেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদে কেন্দ্রিয় কমিটির সহ সভাপতি ও সিলেট অঞ্চলে প্রধান নিবাহী প্রকৌশলী আব্দুল কাদির ও প্রকল্পেব নিবাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া। সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের বিশেষ জজ আদালতে গোপনে হাজিরা দিতে যান শাহাদত আলী। আদালতে জামিন আবেদন করা হলে বিচারক তা নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে কয়েকদিন তার অবস্থান নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানতে পারেন, তিনি দুর্নীতির মামলায় কারাগারে রয়েছেন। সিলেটেই টাঙ্গাইলের সিন্ডিকেট হাজার কোটি কোটি খুটি ক্যাবল তার লোহা ও ট্রান্সফরমা চোরাই পথে বিক্রি করছেন। এদের কাছ থেকে কমিশন আদায় করতেন আব্দুল কাদির ও জিয়াউল হক জিয়া। এদিকে শাহাদত আলীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাকে ঘিরে সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে সামনে এসেছে।
স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য গৃহীত প্রায় ২ হাজার ৫৩ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, ভুয়া বিল উত্তোলন এবং কাজের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে ।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের আওতায় নতুন বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ, সাবস্টেশন সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক কাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের ছাতক, গোবিন্দগঞ্জ ও রাউলী এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। আজ ও কাজ শেষ হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক হাজার বিদ্যুৎ খুঁটি স্থাপনের কথা থাকলেও বাস্তবে তার বড় অংশ স্থাপন করা হয়নি। অনেক স্থানে এখনও সড়কের পাশে খুঁটি পড়ে থাকতে দেখা যায়। একই সঙ্গে ট্রান্সফরমার, কেবল এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, একই কাজের বিপরীতে একাধিকবার বিল উত্তোলন, আংশিক কাজ সম্পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ কাজ দেখানো এবং প্রকল্প ও বিভাগীয় অফিস—উভয় উৎস থেকে অর্থ ছাড়ের অভিযোগও রয়েছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় ও আত্মসাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া গ্রাহকদের কাছ থেকে নতুন সংযোগ, লাইন সম্প্রসারণ ও ট্রান্সফরমার স্থাপনের নামে অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ আদায় করা হয়েছে।
অভিযোগের তীর উঠেছে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, বিল ছাড় এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে কমিশন ও ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে টাঙ্গাইলের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্র সক্রিয় ছিল। দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্প, ক্রয় প্রক্রিয়া, পদায়ন, পদোন্নতি এবং পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের আওতায় রয়েছে। তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এদিকে প্রশাসনিক মহলেও প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি কর্মকর্তা দুর্নীতির মামলার আসামি হওয়ার পরও কীভাবে দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকলেন? সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা প্রভাবশালী মহলের প্রভাব কাজ করেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নিরীক্ষা পরিচালনা করা হোক। প্রকল্পে ব্যবহৃত প্রতিটি টাকার হিসাব, মালামালের ব্যবহার, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়নের প্রকৃত অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। তাদের মতে, জনগণের করের টাকায় বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পে যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাষ্ট্রের ক্ষতিগ্রস্ত অর্থ উদ্ধার করা জরুরি। দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত তথ্য ও দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে।
এব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউল হক জিয়া বলেন সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদির স্যারকে অবগত করে বিভিন্ন উপজেলা সংস্কার করার প্রকল্পের অনুমোদিত দিয়েছে।তার নিদেশে অনেক প্রকল্পের বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
সিলেট অঞ্চলে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল কাদিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কাজে ব্যস্ততার কথা জানিয়ে মোবাইল রেখে দেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকাস্থল প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) চন্দন কুমার সূত্রধর বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। তবে প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।##
Leave a Reply